অর্থনীতি | তারিখঃ এপ্রিল ২৭, ২০২৬ | নিউজ টি পড়া হয়েছেঃ 149 বার

ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ইতিহাসে সর্বোচ্চ নিট মুনাফা অর্জন করেছে ।
২০২৫ সালে ব্যাংকটির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৫১ কোটি টাকায়। এর আগে ২০২৪ সালে করেছিল ১ হাজার ৪৩২ কোটি টাকার নিট মুনাফা। সে হিসাবে গত বছর ব্যাংকটির নিট মুনাফা ৫৭ শতাংশ বেড়েছে। ব্র্যাক ব্যাংকের গতকালের পর্ষদ সভায় ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদন করা হয়েছে। সভা থেকে ব্যাংকটির শেয়ারধারীদের জন্য ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ শতাংশ নগদ ও বাকি ১৫ শতাংশ স্টক হিসেবে দেয়া হবে বলে ব্যাংকটি থেকে জানানো হয়।
প্রাপ্ত তথ্য বলছে, দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ইতিহাসে এই প্রথম কোনো একটি ব্যাংক ২ হাজার কোটি টাকা নিট মুনাফার গণ্ডি ছাড়াল। ব্যাংকটি এমন এক সময় রেকর্ড এ মুনাফা অর্জন করেছে, যখন দেশের অর্ধেকের বেশি ব্যাংক ধুঁকছে। অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে প্রায় এক ডজন ব্যাংক। তাদের বেশির ভাগই গ্রাহকদের আমানতের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না।
ব্র্যাক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৩৯৩তম সভা অনুষ্ঠিত হয় গতকাল। সেখানে ব্যাংকটির ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদনের পাশাপাশি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়েছে। ব্যাংকটির তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ব্র্যাক ব্যাংকের আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৯ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংকটির ঋণ প্রবৃদ্ধিও ছিল ১৭ শতাংশের বেশি। এ সময়ে ব্যাংকটির সমন্বিত (সাবসিডিয়ারিসহ) কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ছিল ২ হাজার ২৫১ কোটি টাকা। এর আগে ২০২৪ সালে ব্যাংকটি সমন্বিতভাবে ১ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা নিট মুনাফা অর্জন করেছিল। সে হিসাবে গত বছর ব্র্যাক ব্যাংকের মুনাফা বেড়েছে ৫৭ শতাংশ। এককভাবে ২০২৪ সালে ব্যাংকটির নিট মুনাফা ছিল ১ হাজার ২১৪ কোটি টাকা। গত বছর এ মুনাফা ৩০ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৫৮১ কোটি টাকায় পৌঁছায়। অর্থাৎ ব্যাংকের মূল কার্যক্রমের চেয়েও বিকাশসহ সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফায় বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
এ বিষয়ে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তারেক রেফাত উল্লাহ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০২৫ সালে ব্র্যাক ব্যাংক যে নিট মুনাফা অর্জন করেছে, এটি দেশের বেসরকারি ব্যাংকের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেকর্ড। এ সাফল্য কোনো চমক নয়, বরং ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সমন্বিত কাজের ফল। দেশের বাজার পরিস্থিতি যেমনই হোক, আমরা সবসময় ব্যাংকে কার্যকর সুশাসন ও মজবুত ভিত্তি ধরে রাখতে পেরেছি। ধারাবাহিক সাফল্যের পরিপ্রেক্ষিতে এ মুনাফা অর্জিত হয়েছে।’
ব্র্যাক ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ছিল ৯ টাকা ১২ পয়সা। ২০২৪ সালে এ আয় ৬ টাকা ১৮ পয়সা ছিল। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষে ব্র্যাক ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) ৫১ টাকা ৫৬ পয়সায় উন্নীত হয়েছে। ২০২৪ সাল শেষে ব্যাংকটির এনএভি ছিল ৩৯ টাকা ৩৮ পয়সা। সে হিসাবে গত বছর এনএভির ক্ষেত্রেও ব্যাংকটি সর্বোচ্চ সাফল্য পেয়েছে।
দেশের ব্যাংক খাত খেলাপি ঋণের ভারে এখন জর্জরিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে গত বছর শেষে দেশের ব্যাংকগুলোর গড় খেলাপি ঋণের হার ছিল প্রায় ৩১ শতাংশ। অবশ্য ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণের এ হার প্রায় ৩৬ শতাংশ ছিল। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও বিপুল সাফল্য দেখাতে পেরেছে ব্র্যাক ব্যাংক। গত ডিসেম্বর শেষে দেশের গড় খেলাপি ঋণের হার ৩১ শতাংশ হলেও ব্র্যাক ব্যাংকের ক্ষেত্রে এ হার ছিল মাত্র ২ দশমিক ২৭ শতাংশ। ২০২৪ সালে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ ছিল। অথচ ব্র্যাক ব্যাংকের মোট ঋণ পোর্টফোলিওর প্রায় অর্ধেক কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি (সিএমএসএমই) খাতের।
ব্যাংকটির শীর্ষ নির্বাহী রেফাত উল্লাহ খান বলছেন, পোর্টফোলিওর বৈচিত্র্য ব্র্যাক ব্যাংকের মুনাফা বাড়াতে সহায়তা করেছে। তিনি বলেন, ‘দেশের ব্যাংকারদের মধ্যে একটি সাধারণ ধারণা হলো এসএমই খাতে খেলাপি ঋণ বেশি। এ খাতে বিনিয়োগ থেকে আয় কম হয়। অথচ আমরা দেখছি, ব্র্যাক ব্যাংকের গড় খেলাপির চেয়েও এসএমই খাতে খেলাপির হার কম। এ খাতের বিনিয়োগ থেকে আমাদের রিটার্নও বেশি। কার্যকর সুশাসন, ডিজিটালাইজেশন ও উদ্ভাবনী উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা গ্রাহকদের আস্থা অর্জনে সামর্থ্য হয়েছি। ব্র্যাক ব্যাংক দেশের কমপ্লায়েন্স ও মূল্যবোধভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের রোল মডেল প্রতিষ্ঠান হিসেবেও সুনাম অর্জন করেছে।’
দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনা পর্ষদের ধরন অনেকটাই ভিন্ন। বর্তমানে ব্যাংকটির মোট শেয়ারের ৪৬ শতাংশের মালিকানা বিশ্বের বৃহত্তম এনজিও ব্র্যাকের হাতে রয়েছে। যদিও এনজিওটির পক্ষ থেকে ব্র্যাক ব্যাংক পর্ষদে মাত্র একজন পরিচালক রয়েছেন। বাকি সব পরিচালকই স্বতন্ত্র হিসেবে নিযুক্ত। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, ব্র্যাক ব্যাংকের মোট শেয়ারের ৩৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ এখন বিদেশীদের হাতে রয়েছে। আর প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ১১ দশমিক ৫১ শতাংশ শেয়ার। দেশের পুঁজিবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ব্যাংকটির মাত্র ৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ শেয়ার রয়েছে।
মালিকানার ধরন ও পর্ষদের বিদ্যমান কাঠামোও ব্যাংকটির সাফল্যের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে বলে জানান জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার ও লেখক ফারুক মঈনউদ্দীন। বর্তমানে ব্র্যাক ব্যাংক পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন তিনি। ফারুক মঈনউদ্দীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ ব্যাংকের ৪৬ শতাংশ শেয়ার বিশ্বের বৃহত্তম এনজিও ব্র্যাকের হাতে রয়েছে। বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে পর্ষদে মনোনীত প্রতিনিধি মাত্র একজন। আমরা বাকি সাত পরিচালকই স্বতন্ত্র হিসেবে নিযুক্ত। আমাদের ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ না থাকার কারণে ব্যাংকটির প্রতিটি কার্যক্রম স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয়। পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সব কাজের প্রধান শর্ত কমপ্লায়েন্স ও সুশাসন।’
ফারুক মঈনউদ্দীন বলেন, ‘এ ব্যাংকের মুনাফার একটি বড় অংশ এনজিও ব্র্যাকের তহবিলে যুক্ত হয়, যা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যয় করা হয়। সে হিসেবে দেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্র্যাক ব্যাংকের ভূমিকা অনন্য।’



Leave a Reply