ব্রহ্মপুত্রের পুবে পাহাড়। তার ওপারে সূর্য ওঠে। অর্ধশত নদ–নদীময় কুড়িগ্রামজুড়ে এই দৃশ্য। শতাধিক চর, তার মধ্যে যেন হাজার বছরের বাংলাদেশ। ষড়ঋতু বছরজুড়ে ফুটে থাকে এখানে। বাড়িতে বাড়িতে এখনো ঢেঁকির শব্দ পাওয়া যায়।

শিল্পায়ন ঘটেনি; কর্মসংস্থানের বড্ড অভাব। অথচ এখানে পর্যটনশিল্পের বিকাশ ঘটতে পারত। তাহলে কিছু কাজের সংস্থান হতো। মানুষ ষোলো আনা নাগরিক হয়েও প্রকৃতির কাছে যায়। যার পাহাড় গেছে, সে কিছু সময়ের জন্য পাহাড়কে ফিরে পাওয়ার জন্য ছোটে। কেউ দেশে দেশে ঘুরে বেড়ায়। মৃত্যু আর জীবনের কালো আর সাদা হৃদয়ে জড়িয়ে যাত্রী মানুষ—আমি কোথায় পাব তারে…।

২.

প্রায় অর্ধশত নদ–নদীকে ব্রহ্মপুত্র কোলে টেনেছে। উজানে ও দুই পাশে যত ছড়া পাহাড় থেকে নেমেছে, সবগুলো ব্রহ্মপুত্র মায়ের মতো আঁচলে আগলে রাখছে। পূর্ব দিকে যখন সূর্য ওঠে, চিলমারী বন্দরে দাঁড়িয়ে মনে হয়, হাজার রঙের শখানেক কামানের রঙের গোলা যেন একসঙ্গে ব্রহ্মপুত্রের ঢেউয়ের মধ্যে আছড়ে পড়ল। চতুর্দিকে রং আর রং। পাহাড়, নদী, নৌকা, গাছপালা, কাঁশবন সব রঙের ছিটায় একাকার। চকোয়া, মাছরাঙা, শুশুক সব। ছোট ছোট ডিঙিগুলো যখন ওই আলোয়, ঢেউয়ে নড়ে; তার ভেতরে জালুয়ার বেটাদের আসমান থেকে নামা জিন মনে হয়। এদের ঠান্ডা নেই, ক্লান্তি নেই—খালি জাল তোলে আর জাল তোলে। সূর্য যখন রং সরায়ে নেবে, তারপর তারা জোড়গাছ ঘাটের কাছে ফিরবে। কারও খাঁচায় বাইন, কারও গুলশা, কারও পৈরালি-কাউয়েট্যাংরা, বোয়াল, কালবাউশ কত জাতের মাছ! মাছের ডাক উঠবে। ২০০, ২১০, ২৩০,…১২০০। বাগাড় মাছ। মিঠাপানির বৃহৎতম মাছটি এখানেই সর্বাধিক ধরা পড়ে। কত মানুষ যে এই মাছ ধরতে গিয়ে জান দিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। আছে বুকে লাল রঙের রুই। ভারত থেকে আসা গঙ্গাধর ও শিয়ালদহ নদে শীতকালে ঘড়েয়া ও পুঁটিতর নামে অপূর্ব স্বাদের দুই ধরনের মাছ পাওয়া যায়। ঘড়েয়া মাছটি ১০ কেজি ও পুঁটিতর মাছটি ২০ কেজি পর্যন্ত হয়। ভাওয়াইয়া গান আছে—গঙ্গাধরের ঘড়েয়া মাছ/শুয়োরের মতো মুখ,/তাক দেখিয়া মোল্লা বেটা/বেজার করল মুখ।

প্রতিবার বর্ষায় চরের জমিতে হাঁটুপলি পড়ে। চরের জমিতে যে ধান-কলাই-বাদাম হয়, তার স্বাদ অতুলনীয়। চরের গৃহিণীরা কেমন করে জানি ডাল রাঁধে, তার অপূর্ব স্বাদ মুখে লেগে থাকবে। এখনো নারীরা এখানে ঢেঁকিতে ধান ভানে। ঘরে ঘরে যে সিঁদল আছে, তা চাইলেই অতিথি সৎকারে তাঁরা হাসিমুখে তুলে দেন। রাত্রিবেলা নৌকায় বসে যে কাউকে ডেকে আপনি ভাওয়াইয়া শুনতে পাবেন। চিলমারীর একদিকে রংপুর-জলপাইগুড়ি, আরেক দিকে গোয়ালপাড়া-গৌরীপুর হওয়ায় ভাওয়াইয়ার আদি রূপটি এখানে পাওয়া যায়। জীবনানন্দের ভাষায়—ভালোবেসে ষোলো আনা নাগরিক যদি/ না হ’য়ে বরং হ’ত ধানসিড়ি নদী।

অষ্টমীর মেলা, সিন্দুরমতীর মেলায় যে লাখ লাখ হিন্দু পুণ্যার্থীর ঢল নামে, তাদের জন্যও সুব্যবস্থা নেই। অথচ ব্রিটিশ আমলে অষ্টমীর মেলা ১৫ দিন ধরে চলত। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লাখ লাখ মানুষ আসত। এই মেলাগুলো আবারও জমে উঠতে পারে। শুধু ধর্মীয় কারণেই নয়, অর্থনৈতিক কারণেও। আমি কার কাছে গিয়া জিগামু সে দুঃখ দেয় ক্যান/ক্যান সিন্দুরমতীর মেলা হয় বিরান পাথার?

মুক্তাঞ্চল রৌমারী। মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র মুক্তাঞ্চল, যেখানে প্রশাসনিক কেন্দ্র, ৬৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধার প্রশিক্ষণসহ রাষ্ট্রীয় সব কর্ম সংঘটিত হয়েছিল। সেই রৌমারী, সেই সিজি জামান হাইস্কুল, সেই শহীদ মিনার, সেই চাঁদমারি, সেই হাট মুক্তিযুদ্ধের সময় ঠিক যেমনটি ছিল, এখনো তাই আছে। এ ছাড়া চিলমারী, ভূরুঙ্গামারীসহ কুড়িগ্রামের সর্বত্র মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ছড়ানো আছে। মুক্তিযুদ্ধের এত জীবন্ত স্মৃতি খুব একটা পাওয়া যায় না।

৩.

কুড়িগ্রামে শিল্পায়ন না হওয়ায় প্রাণ-প্রকৃতি ও মানুষ এখনো আদিম সরলতা ও সৌন্দর্য হারায়নি। তা ছাড়া এখানকার মানুষ ও তাদের সংস্কৃতি, রীতি, আচার, অনুষ্ঠান ইত্যাদি এই অঞ্চল সারা বিশ্বের পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কিন্তু কোথাও পর্যটনশিল্প আপনা–আপনি বিকশিত হয় না; এ জন্য বাস্তব কিছু পদক্ষেপ নিতে হয়। প্রথমত আমরা স্বদেশের পর্যটক বা ভ্রমণবিলাসী মানুষের কথা ভাবতে পারি। এখন বাংলাদেশের অনেক মানুষ দেশের ভেতরে ও বাইরে ভ্রমণে যায়। সুন্দরবন, পাবর্ত্য চট্টগ্রাম বা সিলেট অঞ্চলেই তারা বেশি যায়। কুড়িগ্রামও যে ভ্রমণের জায়গা হতে পারে, এটা হয়তো কেউ ভাবে না। কিন্তু আসলেই তা হতে পারে। বিদেশি পর্যটকদের জন্যও একই কথা বলা যায়। বিদেশ থেকে যারা আসে তারা সুন্দরবন, কক্সবাজার, বান্দরবান ইত্যাদির কথা জানে; সেসব জায়গাতেই বেড়াতে যায়। কুড়িগ্রামের কথা তারা জানে না। জানানোর ব্যবস্থা করা যায়। তবে সে জন্য প্রথমে প্রয়োজন পর্যটনশিল্পের বিকাশ।

সারা দুনিয়ায় ক্ষুদ্র পুঁজিভিত্তিক কমিউনিটি পর্যটন চালু হয়েছে। চরে বাড়িগুলোতে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা করা গেলে গৃহস্থরা এখান থেকে মাসে ভালো আয় করতে পারবেন। পর্যটকেরা বড় পুঁজির হোটেলে থাকার চেয়ে এই গৃহস্থ বাড়িতে থাকতে আগ্রহী হবেন বেশি। এতে তাঁরা স্থানীয় জীবন-সংস্কৃতি সম্পর্কেও অবগত হবেন। সাংস্কৃতিক বিনিময়ও ঘটবে। পর্যটকেরা যখন চরের নানান জাতের চালের ভাত খেতে আগ্রহী হবেন, তখন কৃষকেরা তাঁদের ধান-সংস্কৃতি রক্ষায়ও আগ্রহী হবেন।

উত্তরের নেপালের ৮০ ভাগ আয় আসে পর্যটন খাত থেকে। কুড়িগ্রামে এতকাল যে শিল্পায়ন ঘটেনি, এটা তার আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে। অতি সম্প্রতি গণকমিটির আন্দোলনের ফলে ঢাকা থেকে কুড়িগ্রাম পর্যন্ত আন্তনগর ট্রেন চালু হয়েছে। চাইলে কেবিনে শুয়েও চলে আসা যায়। ঢাকায় রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে চড়ে সকাল ৬টা ২০ মিনিটে কুড়িগ্রাম পৌঁছাবেন। চাইলে নৌকাযোগে ঢাকায়ও ফিরতে পারেন চিলমারী থেকে। সব সম্ভব। তবে রাষ্ট্র ও গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসতে হবে।-পথ চিনে এ ধুলোয় নিজের জন্মের চিহ্ন চেনাতে।

নাহিদ হাসান: রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভাপতি
[email protected]
উৎস -প্রথম আলো