গতকাল (১২ জানুয়ারি ২০২০) রাত ৮টা ৪০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালে (পিজি) প্রতীতি দেবী চলে গেলেন অনন্তলোকে। আজ শেষবারের মত তাঁর দেহ নেওয়া হয়েছিল বড় মগবাজারের বাসস্থান সেঞ্চুরি টাওয়ারে। সেখানে তাঁকে সবাই শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য মৃত্যুর আগেই লিখিতভাবে দেহদান করে গিয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটকের যমজ বোন প্রতীতি দেবী। দুপুর ১টায় আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়ে অ্যারোমা দত্তসহ কয়েকজন আত্মীয় ও শুভানুধ্যায়ী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতীতি দেবীর দেহ হস্তান্তর করেন। দিদিকে নিয়ে যাওয়ার পরেও আমরা সেঞ্চুরি টাওয়ারে কিছুক্ষণ রাহুলদার সাথে ছিলাম।
দেশভাগের পর দুই যমজ ভাইবোন ঋত্বিক ঘটক আর প্রতীতি দেবী দু'জন দুই দেশের হয়ে গেলেন। ঋত্বিক সারাজীবন দেশভাগের এই কষ্ট মন থেকে মানতে পারেননি। আজ ঋত্বিক ঘটকের পরিবারের সর্বশেষ চিন্থটুকু আমরা হারালাম। ভবা আর ভবি। এখন দু'জনই ইতিহাস।
তৎকালীন ঢাকার ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট সুরেশ ঘটক ও ইন্দুবালা দেবী'র নয় সন্তান। পাঁচ ছেলে মনীশ ঘটক, সুদীশ ঘটক, আশিষ ঘটক, লোকেশ ঘটক ও ঋত্বিক ঘটক এবং চার মেয়ে সম্প্রীতি ঘটক, তপতী ঘটক, ব্রততী ঘটক ও প্রতীতি ঘটক। এর মধ্যে অষ্টম সন্তান ঋত্বিক ও নবম সন্তান প্রতীতি দেবী ছিলেন যমজ ভাইবোন। প্রতীতি দেবী ছিলেন ঋত্বিকের চেয়ে ৫ মিনিটের ছোট।
প্রতীতি দেবী ও ঋত্বিক ঘটকের বড় ভাই মনীশ ঘটক ছিলেন কবি ও ঔপন্যাসিক। তাঁর মেয়ে মহাশ্বেতা দেবীও ছিলেন লেখক। যার ডাকনাম ছিল খুকু। খুকু, ভবা আর ভবি খুব কাছাকাছি বয়সের ছিলেন। খুকু'র স্বামী ছিলেন নাট্যকার ও অভিনেতা বিজন ভট্টাচার্য। মহাশ্বেতা দেবী ও বিজন ভট্টাচার্যের পুত্র ছিলেন নবারুণ ভট্টাচার্য। যিনি ফ্যাতাড়ু নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন।
সুরেশ ঘটকের দ্বিতীয় ছেলের নাম সুদীশ ঘটক। তিনি ছিলেন একজন সিনেমাটোগ্রাফার। তৃতীয় ছেলে আশিষ ঘটক যার মেয়ের ঘরের নাতী হলেন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় (বাবা সতিনাথ চ্যাটার্জি ও মা সুনেত্রা ঘটক) একজন অভিনেতা, নির্মাতা ও প্রডিউচার। সুরেশ ঘটকের চতুর্থ ছেলের নাম লোকেশ ঘটক। যিনি ছিলেন একজন লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট।
আর পঞ্চম ছেলে ঋত্বিক ঘটক ছিলেন ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম মাস্টার নির্মাতা ও চিত্রনাট্যকার। ঋত্বিক ঘটকের স্ত্রীর নাম সুরমা ঘটক। একছেলে ঋতবান ঘটক, যিনি একজন নির্মাতা ও দুই মেয়ে সংহিতা ঘটক ও সুচিশ্মিতা ঘটক।
প্রতীতি দেবী'র বিয়ে হয়েছিল কুমিল্লার আরেক বিখ্যাত পরিবারে। তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের বিশিষ্ট পার্লামেন্টারিয়ান ও যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী ও ভাষাসংগ্রামী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, যিনি পাকিস্তান পার্লামেন্টে প্রথম বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি করেছিলেন, যিনি ও তাঁর ছোট ছেলে দিলীপ কুমার দত্ত একাত্তরে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ হন।
তাঁর পুত্র সঞ্জীব দত্তের সাথে বিয়ে হয় প্রতীতি দেবী'র। প্রতীতি দেবী ঘটক ও সঞ্জীব দত্তের দুই ছেলে মেয়ে। অ্যারোমা দ্ত্ত, যিনি বাংলাদেশের বর্তমান সংসদের একজন সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য এবং রাহুল দত্ত।
প্রতীতি দেবী ঘটক যমজ ভাই ঋত্বিককে নিয়ে লিখেছেন 'ঋত্বিককে শেষ ভালোবাসা' স্মৃতিগ্রন্থটি। ১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর পুরান ঢাকার ঋষিকেশ দাশ লেনের ১ নম্বর বাড়িতে ভবা আর ভবি'র জন্ম। গতকাল ৯৫ বছর বয়সে ভবিও আমাদের ছেড়ে ইতিহাস হয়ে গেলেন। প্রতীতি দেবী'র আত্মার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
আজ সেঞ্চুরি টাওয়ারে বাংলাদেশের কোনো টেলিভিশন চ্যানেল যায়নি। যায়নি বাংলাদেশের কোনো দৈনিক পত্রিকার কোনো সাংবাদিক। অথচ আমাদের পঞ্চাশের উপরে টেলিভিশন চ্যানেল আছে। আমাদের একশো'র উপরে দৈনিক সংবাদপত্র আছে। এরা সবাই রাজনৈতিক দলের লোকজনদের টাউট-বাটপারদের পেছনে সারাক্ষণ আঠার মত লেগে থাকে।
দেশের ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের যেখানে আজ পরিসমাপ্তি হলো, সেখানে আমাদের মিডিয়ার অনুপস্থিতিই বলে দেয় আমরা জাতি হিসেবে কতোটা অধপতনে গেছি। আমি মিডিয়ার এই উপস্থিত না থাকাকে চরমভাবে ধিক্কার জানাই। প্রতিবাদ জানাই। ক্ষোভ জানাই।
আমাদের নষ্ট রাজনীতির মত আমাদের মিডিয়াও এখন যেখানে খাবারের উচ্ছিষ্ট আছে, সেখানে দৌঁড়ঝাপ করে। মিডিয়ার এই চরম অবনতি একটি রাষ্ট্রের জন্যও চরম অবমাননাকর বলেই আমি মনে করি।উৎস -ফেসবুক